জ্যোৎস্না চক্রবর্তী

বটতলা সম্মাননা ২০১৬
৬ ডিসেম্বর ২০১৬ মঙ্গলবার
ময়মনসিংহ বিভাগ

১৯৫২ সালের অক্টোবরে জন্মগ্রহণ করেন জ্যোৎস্না চক্রবর্তী। মেঘবরণ কন্যার নাম বাবা ধীরেন চক্রবর্তী রাখেন জ্যোৎস্না চক্রবর্তী। এক দুই তিন করে চৌদ্দ বছর যায়। ধীরেন চক্রবর্তীর সংসারে চাকা দারিদ্রের বঞ্চনায় শ্লথ হয়। চক্রবর্তীর গলার কীর্তন গানের সুর মানুষের মনকে কানায় কানায় ভরিয়ে দিলেও শূন্য হাড়িতে অন্ন জুটেনা, আর মা অমৃত সুন্দরী বিড়ির পাতা কেটে আর ঠোঙা বানিয়ে সংসার চালাতেন বহু কষ্টে। নতুন বাজার মডেল স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে মহাকালী গালর্স স্কুলে অষ্টম শ্রেণী পেরিয়েই জ্যোৎস্নার লেখাপড়ার পাট চুকলো। বেঁচে থাকার তাগিদ থেকে ১৯৬২ সালে আকুয়াতে মঞ্চস্থ শেষ রাতের তারা নাটকের মধ্যে দিয়ে কিশোরী জ্যোৎস্নার অভিনয় জীবনে পদার্পন। সে সময়ের মঞ্চে নারী চরিত্র রূপায়নের শিল্পীর আকালহেতু অল্প সময়েই জ্যোৎস্নার ময়মনসিংহ নাট্যাঙ্গনে অনিবার্য হয়ে উঠলেন। শখ উপচে অভিনয়টা এক সময় পেশা হিসেবেই নেন। চেনা পথেই নিরন্তর পথচলা। সময়ের প্রেক্ষাপটে নাট্যমঞ্চ চাহিদার তাগিত মেটাতে না পারায় জ্যোৎস্না চক্রবর্তীর ঠিকানা হয় যাত্রামঞ্চ। তৎকালীন পাকিস্তানের যাত্রা সংগঠন রয়েল অপেরায় তারকা শিল্পী হয়ে উঠেন তিনি। স্বাধীনতার পর বহুসংখ্যক নাটকে তার দেখা মেলে। যোগ দেন ভাগ্যলক্ষ্মী অপেরায়। কিন্তু ভাগ্যে তার লক্ষ্মীর সান্নিধ্য মেলেনা। কিন্তু ততদিনে জ্যোৎস্না চক্রবর্তী জেনে গেছেন তার জীবনের একমাত্র ঠিকানা, একমাত্র ভালবাসা হচ্ছে অভিনয় আর অভিনয়। জীবন নদীর তীরে, অনুসন্ধান, নীচুতলার মানুষ, একটি পয়সা দাও, যাদব বাবুর সংসার- এর মত দেশকাঁপানো যাত্রাপালার সাড়া যাগানো অভিনেত্রী জ্যোৎস্না চক্রবর্তী। নিঃসীম অন্ধকারে খুঁজে ফেরেন জীবনের অমিয় সুধা। যাত্রী হন বহুরূপী নাট্য সংস্থা, মুখোশ নাট্য সংস্থা, ঝিলিক নাট্য সংস্থা, অক্ষর নাট্য সংস্থার পরিক্রমায়। বহুরূপী নাট্য সংস্থার মাস্তান সুন্দরী ও জোৎস্নার পাগলী চরিত্রের মতো চরিত্রের সন্ধানে সাড়া দিয়ে চলেন নিরবিচ্ছিন্ন আমন্ত্রণে। বিস্তৃতি কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ জ্যোৎস্না চক্রবর্তী বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটারের ২০১২ সালের ঢাকা বিভাগীয় সম্মেলনে ২০১২ তে ময়মনসিংহের নাট্যাঙ্গনে বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা পদকসহ একাধিক স্বীকৃতি পান। ক্লান্ত, অবসন্ন আর অতৃপ্ত জ্যোৎস্না চক্রবর্তী ৭০ বছরের পথচলার একসময় তিন ছেলে তিন মেয়ে আর অসুস্থ স্বামীকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চান নিজস্ব ভুবনে। কিন্তু ইতোমধ্যে পাঁচবার স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন এই শিল্পী। ক্ষত-বিক্ষত-বিধ্বস্ত করে দিয়েছে তার সুখ নামক মায়াবী সামিয়ানাকে।
ময়মনসিংহের নাট্যচর্চার অগ্রপথিক এমন একজন সৃজনশীল নাট্যজনের অবদান শ্রদ্ধাভরে স্বীকার করে বটতলা। তিনি বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় এক বাতিঘর- ভাবীকালের মঞ্চকর্মীদের প্রেরণা। ময়মনসিংহ বিভাগের বটতলা সম্মাননা ২০১৬ জ্যোৎস্না চক্রবর্তীকে দিতে পেরে বটতলা আনন্দিত।